ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭, ০৪ মার্চ ২০২১, ১৯ রজব ১৪৪২

মুক্তমত

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে ফিরে দেখা ইতিহাস

পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার পথে উত্তাল-তরঙ্গের দিনগুলি-২

অধ্যাপক ড. এ কে এম মাহবুব হাসান, অতিথি লেখক | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৬১২ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২১
পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার পথে উত্তাল-তরঙ্গের দিনগুলি-২

দ্বিতীয় পর্ব 
শেখ মুজিবের ছয় দফা আদায়ে অগ্নিরূপ আন্দোলন ও পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার পটভূমি 

‘ছয় দফা’ দুটি সাধারণ শব্দ নয় কিংবা তাৎক্ষণিকভাবেও এর আবির্ভাব হয়নি, বরং এর আবর্তন ও বিবর্তন হয়েছে ধাপে ধাপে ঐতিহাসিকভাবে। ৫-৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬ লাহোরে পাকিস্তানের বিরোধী রাজনৈতিক দলের সম্মেলনে শেখ মুজিব সাবজেক্ট কমিটির সভায় উপস্থাপনকৃত ৬ দফা সম্মেলনে আলোচনার জন্য গৃহীত না হলে তিনি সম্মেলন বয়কট করেন।

 

১৮-২০ মার্চ ১৯৬৬ মতিঝিলের ইডেন হোটেলে দলের কাউন্সিল অধিবেশনে ৬ দফা অনুমোদিত হয়। শেখ মুজিব সভাপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। শেখ মুজিব ৬ দফাকে বাঙালির মুক্তির মহাসনদ হিসাবে আখ্যায়িত করে জনগণের মাঝে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিলে তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আইয়ুব খান ৬ দফার প্রবক্তা শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের এক নম্বর দুশমন হিসাবে চিহ্নিত করে তাকেসহ শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের গ্রেপ্তার করা শুরু করেন।  

শেখ মুজিবসহ সকল কারাবন্দী নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবিতে ৭ জুন ১৯৬৬ পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল আহবান করা হলে তা সর্বাত্মকভাবে পালিত হয়। ১৯৬৭ সালে পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী লীগে সাময়িক অস্থিরতা দেখা দিলেও শেষ পর্যন্ত ১৯-২০ অক্টোবর ১৯৬৮ মতিঝিলের ইডেন হোটেলে অনুষ্ঠিত দলের কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ মুজিবকে পুনরায় সভাপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে ৬ দফার প্রতি পুনসমর্থন ব্যক্ত করে সকল রাজনৈতিক নেতাদের মুক্তি দাবি করা হয়। ৬ দফার ওপর ভিত্তি করে বাঙালি ও পূর্ব বাংলার অধিকার আদায়ের এক নতুন সংগ্রামের ভিত্তি রচিত হতে শুরু করে।

৩ জানুয়ারি ১৯৬৮ শেখ মুজিবকে এক নম্বর এবং পাকিস্তান নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনকে দুই নম্বর আসামি করে মোট ৩৫ জনের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য’ শিরোনামে একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয় যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসাবে পরিচিতি পায়। ১৯৬৩ সালের ফৌজদারি আইন সংশোধনী (বিশেষ ট্রাইবুনাল অর্ডিন্যান্স)-এর ৪ ধারা অনুযায়ী ২১ এপ্রিল ১৯৬৮ এক বিজ্ঞপ্তি দ্বারা অভিযুক্তদের বিচারের জন্য পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি শেখ আবদুর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়। ১৯ জুন এই ট্রাইবুনাল ঢাকার কুর্মিটোলা সেনানিবাসে উক্ত মামলার বিচারকার্য শুরু করে।  অভিযুক্তরা পছন্দমত আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ পেলে শেখ মুজিবের পক্ষে আবদুস সালাম খান প্রধান কৌঁসুলি হিসাবে নিযুক্ত হন এবং লন্ডনের আইনজীবী টমাস উইলিয়াম মামলার বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন। শেখ মুজিব ও অন্যান্যদের মুক্তির দাবিতে হরতাল পালনসহ নানা কর্মসূচিতে পূর্ব বাংলা উত্তপ্ত হতে শুরু করে। ষড়যন্ত্রমূলক মামলার প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের আন্দোলন।

১ জানুয়ারি ১৯৬৯ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করা হলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার ফলস্বরূপ ছাত্র সংগঠনগুলো ৮ জানুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারসহ ১১ দফা নির্ধারণপূর্বক কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন। ১৮ জানুয়ারি থেকে শুরু করা ছাত্র ধর্মঘটে ২০ জানুয়ারি ঢাকা কলেজের সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র আসাদুজ্জামান, ২৪ জানুয়ারি নবকুমার ইন্সটিটিউটের ছাত্র মতিউর, ২৪ জানুয়ারি সন্ধ্যায় ২৪ ঘণ্টার জন্য সান্ধ্য আইন জারি ও সেনাবাহিনী তলব অবস্থায় ২৫ জানুয়ারি ঢাকার নাখালপাড়ায় গৃহবধূ আনোয়ারা, ১৫ ফেব্রুয়ারি আগরতলা মামলার আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হক, ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা নিহত হলে নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে ৬ দফা এবং আগরতলার মামলা প্রত্যাহারসহ ১১ দফা দাবির আন্দোলন সারা পূর্ব বাংলায় আগুনের মত ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনে আপামর জনসাধারণ ১৪৪ ধারা লঙ্ঘন, কার্ফু ভঙ্গসহ সকল বাধা উপেক্ষা করে বাংলার মাটিকে প্রকম্পিত করে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ আইয়ুবকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার এবং শেখ মুজিবকে নিঃশর্ত মুক্তিদানে বাধ্য করে।  

পাকিস্তান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ায় আইয়ুবের ১০ বছর ৬ মাসের (৭ অক্টোবর ১৯৫৮-২৪ মার্চ ১৯৬৯) শাসনক্ষমতার অবসান ঘটে। জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ ১৯৬৯ প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসাবে পাকিস্তানের ক্ষমতা হাতে নিয়ে সংবিধান বাতিল এবং জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। নতুন এই শাসকের ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান প্রবেশ করে এক ভিন্নমাত্রার ষড়যন্ত্রের অধ্যায়ে।

১ জানুয়ারি ১৯৭০ রাজনৈতিক কর্মকান্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে ১১ জানুয়ারি পল্টনের জনসভা থেকে শেখ মুজিব ৬ দফার প্রচারণা শুরু করেন। ৬ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গার জনসভায় মুসলীম লীগ নেতৃবৃন্দ শেখ মুজিবকে লক্ষ্য করে ‘ছয় দফা ছাড়ুন, প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ করুন’ বলে বক্তব্য দিলে ৯ এপ্রিল বাগেরহাটের জনসভা থেকে শেখ মুজিব জবাব দিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রিত্ব নয়, শোষণ ও অবিচারের শৃঙ্খল থেকে দেশের মানুষকে মুক্ত করার জন্যই আমার সংগ্রাম’।  

৪-৫ জুন ১৯৭০ মতিঝিলের ইডেন হোটেলে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ মুজিব সভাপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং একই স্থানে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ মুজিব সভাপতি এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে সাধারণ সম্পাদক করে দলের নেতৃত্ব প্রদান করা হয়। শেখ মুজিব রেসকোর্স ময়দানে ৭ জুন ১৯৭০ আওয়ামী লীগের জনসভায় ৬টি পায়রা উড়িয়ে বক্তব্য শুরু করে ৬ দফার গুরুত্ব প্রচার করেন। শেখ মুজিব ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭০ সালে ঢাকার ধোলাইখালে প্রথম নির্বাচনী জনসভার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন এবং পূর্ব বাংলার মানুষের দাবি আদায় ও শাসকগোষ্ঠীর শোষণ-বঞ্চণার অবসানের লক্ষ্য নিয়ে ৬ দফা বাস্তবায়নে দেশবাসীকে আওয়ামী লীগকে ভোট প্রদানের আবেদন করতে থাকেন।  

শেখ মুজিবের পছন্দ অনুযায়ী ৮ অক্টোবর ১৯৭০ ইসলামাবাদ থেকে বরাদ্দ করা নির্বাচনী প্রতীকে আওয়ামী লীগ পায় কাঠের নৌকা। পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে ১৬০টি আসন এবং প্রাদেশিক পরিষদে ২৯৮টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করে। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে কিভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় তার জন্য ৮১ আসনে বিজয়ী পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টোকে সাথে নিয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এক গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। পাকিস্তানি শাসকদের এই ষড়যন্ত্র দৃশ্যমান হতে থাকলে শেখ মুজিবের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার জনগণও নিজেদের দাবি আদায়ে যেমন ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে তেমনি বাংলার আকাশে স্বাধীন সূর্য উদয়ের স্বপ্নও দৃঢ় হতে থাকে। (চলবে)

পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার পথে উত্তাল-তরঙ্গের দিনগুলি-১

লেখক: অধ্যাপক, প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa